কোথাও ঘুরতে যাওয়ার বাতিক উঠলে প্রথমে চিন্তা আসে রাস্তা কেমন, কোন সময়ে রাস্তা ভালো থাকে। অনেকেই জানেন যে জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে স্পিটি ভ্যালি যাওয়ার রাস্তা খোলা থাকে এবং ঘোরার জন্যও বেস্ট। কিন্তু কেউ যখন শীতের সময় নভেম্বর, ডিসেম্বর বা শরৎ এর সময় (সেপ্টেম্বর/অক্টোবর) মাসে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা করে তখন কনফিউশন তৈরি হয়ে থাকে অর্থাৎ রাস্তা খোলা থাকবে কিনা বা খোলা থাকলেও সেটি যাতায়াতের জন্য ভালো হবে কিনা, নানাবিধ প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক করে। নিচে কিছু পয়েন্টের মাধ্যমে একদম ভেংগেচুরে বলবো যাতে আপনার সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে এবং নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন স্পিটি ভ্যালির রাস্তা ও এরিয়া সম্পর্কে। তো চলুন শুরু করা যাক—-

স্পিটি ভ্যালির রাস্তা (Spiti valley roads)

স্পিটি ভ্যালি যাওয়ার জন্য দুটি রাস্তা বিদ্যমান। একটি হলো শিমলা সাইডের রাস্তা। শিমলা থেকে কাজা পর্যন্ত অর্থাৎ (স্পিটি ভ্যালি) প্রায় ৪১৫ কিমি দূরত্ব এবং এই রুট দিয়ে যেতে অন্তত ২ দিন সময় লাগবে এবং সারা বছর রাস্তা খোলা থাকে তাই যে কোন সময়ে যেতে পারবেন।

অপরদিকে মানালি সাইড দিয়ে যেতে মাত্র ৭/৮ ঘন্টা সময় লাগে অর্থাৎ প্রায় ২০০ কিমি দূরত্ব কিন্তু রাস্তা মাত্র ৪ মাসের জন্য খোলা থাকে বাকি সময় বরফের জন্য বন্ধ থাকে। এই রুট দিয়ে দ্রুত যেতে পারবেন।

এখানে কাজা (Kaza) হচ্ছে একটি স্থানের নাম (স্পিটি) ভ্যালির মেইন কেন্দ্র অর্থাৎ এখানে গিয়ে আপনাকে হোটেলে বা গেস্ট হাউজে উঠতে হবে আর এই কাজা থেকে প্রায় ১০/১৫ কিমি এরিয়া জুড়ে ঘোরার জন্য আরো সুন্দর সুন্দর গ্রাম রয়েছে। তাই স্পিটি ভ্যালির বিষয় আসলে কাজাকে ফোকাসিং করা হয়ে থাকে। নিচে শিমলা ও মানালি সাইডের রাস্তার বিস্তারিত তুলে ধরছি যাতে আপনার জন্য আরো সুবিধা হবে এবং খুটিনাটি অনেক বিষয় বুঝতে পারবেন।

শিমলা টু কাজা রোড

শিমলা থেকে প্রায় ৪১৫ কিমি দূরে এবং যাওয়ার সময় পাহাড়ের অসাধারণ সৌন্দর্য আপনাকে অবাক করে দিবে, মনে হবে এতো সুন্দর পৃথিবী। সবুজ পাহাড় ঘেরা কিন্নোর জেলার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। আগেই উল্লেখ করেছি যে এই রোড সারা বছর খোলা থাকে। শীতের সময় শিমলা থেকে রওনা দিয়ে কুফরি হয়ে নারকান্দা তারপর নাকো এবং শেষ সিমানা কাজা পর্যন্ত স্নো দেখতে পারবেন যা সত্যই মনকে দিবে প্রশান্তি।

মূলত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে রাস্তা পুরাই বরফে আবৃত থাকে কিন্তু অথোরিটি দ্রুত রাস্তা পরিস্কার করে চলাচলের ব্যবস্থা করে দেয়। তাই টেনশনের কিছু নেই। আপনি এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত তেমন কোন ঝামেলা ছাড়াই ঘুরাঘুরি করতে পারবেন কিন্তু জানুয়ারী থেকে মার্চ পর্যন্ত খুব খুব কঠিন। আপনার যদি বরফের মধ্যে ঘুরাঘুরি প্যাশন হয়ে থাকে সেটা ভিন্ন বিষয় তবে এক্ষেত্রে ফ্যামিলি বা চাইল্ড না নেওয়া ভালো। আপনি চাইলে একদিনের মধ্যে কাজা পৌঁছাতে পারেন কিন্তু সেটা আপনার শরীরের জন্য খুবই খারাপ হবে অর্থাৎ ঘুম কামায় দিয়ে পৌঁছাতে হবে। যেহেতু শিমলা সাইড দিয়ে ৪১৫ কিমি দূরত্ব এবং সম্পূর্ণ পাহাড়ি রাস্তা তাই যাত্রাপথে কোথাও এক রাত কাটিয়ে পরের দিন ফ্রেশ মুডে আবার রওনা দেওয়া উচিত তাহলে ভ্রমণটি উপভোগ করতে পারবেন নতুবা ক্লান্তিতে অনেক কিছু মনে ধরবে না।

মানালি টু কাজা রোড

মানালি সাইড দিয়ে সবচেয়ে কাছে এবং কম সময় লাগে অর্থাৎ ২০০ কিমি পথ যা ৮/৯ ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। তবে এই রোড হচ্ছে খুবই ভয়ংকর ও ঝুকিপূর্ণ কারণ রাস্তা অনেক সরু আর অনেক অনেক উচু পাহাড় অতিক্রম করে যেতে হয় যা হয়তো আপনার জীবনে কখনো ভাবতে পারেন নাই। এই রোড দিয়ে যেতে হলে আপনাকে জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে সেপ্টেম্বর এর মধ্যে যেতে হবে কারণ অন্য সময় বরফে ঢাকা থাকে। BRO অথোরিটি মার্চ এর শেষ দিক থেকে মে মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত পরিস্কার করে তাই জুনের ২য় সপ্তাহ থেকে চলাচল করতে কোন সমস্যা নেই।

সাহারান টু কাজা রোড

আপনি যদি শিমলা সাইড দিয়ে যাতায়াত করেন এবং সাহারান (Saharan) এ এক রাত থাকতে চান তাহলে আপনাকে Jeori নামক স্থানে নামতে হবে যদি লোকাল বাসে যাতায়াত করেন। শিমলা থেকে সাহারান প্রায় ১৬০ কিমি দূরে অবস্থিত। জিয়রী নেমে শেয়ারড ট্যাক্সি করে সাহারান যেতে হবে, খুব বেশি সময় লাগবে না। সাহারান শহরটি মাত্র ১৮ কিমি এরিয়া নিয়ে বিস্তৃত। এটি সারা বছরই খোলা থাকে তবে জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারী মাসে সাহারান যাওয়ার রাস্তা ব্লকড থাকে অর্থাৎ অটোরিটি যদি পরিস্কার করে তবে যেতে পারবেন নতুবা নয় তাই এই সময়ে সারাহান ঘোরার তালিকাতে না রাখা উত্তম।

শিমলা টু কালপা রোড

কালপা হচ্ছে অসাধারণ এক স্থান যার অবস্থান প্রায় ৯৮০০ ফুট উপরে এবং কিন্নোর জেলার মধ্যে। এটি একদম Reckong Peo এর কাছে অর্থাৎ এখান থেকে মাত্র ৩ কিমি ভিতরের দিকে অবস্থিত। আপনি যদি এখানে ১ রাত কাটাতে চান তাহলে Reckong পেও বাস স্ট্যান্ডে নামতে হবে যদি বাসে যান আর প্রাইভেট কারে গেলে সরাসরি কালপা হোটেলে গিয়ে উঠবেন। এই কালপাতে Death Zone আছে যেখানে অনেকে সুইসাইড করে থাকে পাহাড় থেকে নিচে পড়ে। এটি সারা বছর খোলা থাকে, কোন সমস্যা নেই।

শিমলা টু চিতকুল (Chitkul) রোড

আপনি যখন চিতকুলের কাছাকাছি পৌঁছাবেন তখন Karcham হাইওয়ে হয়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকবেন এবং সাংলা (Shagla) থেকে প্রায় ৪৩ কিমি পথ পাড়ি দিলেই চিতকুল পাবেন এবং শিমলা থেকে চিতকুলের দূরত্ব প্রায় ২৪৫ কি.মি। যদি চিতকুলে একরাত থাকতে চান তাহলে চিতকুল নেমে যাবেন, কোন এক হোটেলে উঠবেন এবং সেখানের সৌন্দর্য উপভোগ করবেন। শুধু জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারী মাস বরফে ঢাকা থাকে তাই এই সময়ে না যাওয়াই বেটার অন্য মাসে যেতে পারেন। এসব এরিয়া মূলত মেইন রাস্তা থেকে একটু ভিতরের দিকে তাই বরফ বেশি পরিমাণ জমে।

শিমলা টু পিন ভ্যালি রোড

Pin valley একটি অসাধারণ স্থান। এটি ১৭ টি গ্রাম নিয়ে গঠিত এবং ৯৫% মানুষ বৌদ্ধ ধর্মের এবং মানুষের সংখ্যা খুবই কম যেমন ১৯০০/২০০০ লোকের বসবাস। শিমলা থেকে কাজা যেতে হবে তারপর সেখানকার কোন হোটেলে উঠে পিন ভ্যালি যেতে পারবেন। কাজা থেকে মাত্র ১৬ কিমি দূরে পিন ভ্যালি এবং একটি ব্রীজ রয়েছে যা Attargo Bridge নামে পরিচিত। এই ব্রীজ কাজা ও পিন ভ্যালিকে বিভক্ত করেছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত হেভি স্নোফলের কারণে বন্ধ থাকে এবং এই ব্রীজ পার হওয়ার পর রাস্তা খুব বেশি ভালো নয়। পিন ভ্যালি আপনার ঘোরার তালিকাতে রাখতে পারেন।

কিব্বর – কমিক গ্রাম (Kibber-Comik village)

এখানে যেতে হলে আপনাকে আগে কাজা পৌঁছাতে হবে তারপর এই ছোট গ্রামগুলোতে ঘুরতে পারেন। কাজা থেকে বেশি দূরে নয়। তবে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে ভারি স্নোফলের জন্য এখানে যাওয়ার রাস্তা ব্লকড হয়ে যায় তাই জুন থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে যেতে পারবেন। কাজা থেকে ৪ সিটের একটা প্রাইভেট কার ভাড়া করে এসব ছোট ছোট গ্রাম গুলো দেখতে পারেন।

কাজা টু চন্দরাতল (Chandaratal) রোড

কথিত আছে চন্দরাতল লেকে ঘুরা ছাড়া স্পিটি ভ্যালি যাওয়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অসাধারণ এক স্বচ্ছ ও নীল পানির লেক যা প্রায় ১৬০০০ ফুট উপরে অবস্থিত এবং কাজা থেকে মানালি রোড দিয়ে যাওয়ার পথে এই লেকে যাওয়া যায় অর্থাৎ কুঞ্জুম হাই হিল পাসিং থেকে ১০ কিমি ভিতরের দিকে অবস্থিত। এই পথটি নভেম্বর টু মে মাস পর্যন্ত বন্ধ থাকে বরফের জন্য তবে যেতে হলে জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের যে কোন সময় গিয়ে থাকতে পারবেন।

আশা করছি উপরের তথ্যগুলো জানার পর স্পিটি ভ্যালি ঘুরতে আপনার জন্য আরো সহজ হবে এবং আরো কিছু জানার দরকার হলে কমেন্টস বা মেসেজ করুন, দ্রুত রিপ্লাই দেওয়ার চেস্টা করবো।

লেখাঃ শেখ আব্দুর রহমান

ভ্রমণ হবে সহজে

"পরবর্তীতে পড়ার জন্য শেয়ার করে রাখুন"