ফ্যামিলি নিয়ে কিভাবে ১৫০০০ ফুট উপরে অবস্থিত স্পিটি ভ্যালি ভ্রমণ করবেন? বিস্তারিত গাইডলাইন পড়ুন।

কয়েক বছর আগেও কারো কাছ থেকে স্পিটি ভ্যালি সম্পর্কে ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরে আসার কথা শোনার সাথে সাথে জিজ্ঞেস করতেন সেটা আবার কোথায় বা হেসে উড়িয়ে দিতেন কারণ ভারতের বুকে এরকম জায়গা থাকতে পারে সেটা হয়তো আপনার অজানা অথবা রেস্ট্রিকটেড এরিয়া তাই হয়তো শুনে অবাক হতেন।এমনকি এই এরিয়া সম্পূর্ণ দূর্গম স্থান যার কারণে অনেকের অজানা তাছাড়া চরম ভয়ংকর রাস্তা। অনেক উঁচু পাহাড় অর্থাৎ ১৫০০০+ উপরে পবস্থিত। অনেকে এই এরিয়াটি বাইক লাভারদের স্থান হিসেবে চিনে থাকে অর্থাৎ যারা লং বাইক চালাতে পছন্দ করেন তারা ঘর থেকে স্পিটি ভ্যালি ভ্রমণের জন্য ২০/২৫ দিনের জন্য বের হয়।

তাই ফ্যামিলি নিয়ে ঘোরার চিন্তা অনেকের মাথায় আসে না যেহেতু বহু দূর অবস্থিত। পৃথিবীর বিপদজনক যতগুলো রাস্তা আছে স্পিটি ভ্যালি তার মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে ট্যুরিজম খাত যথেষ্ট এগিয়ে যাচ্ছে।এমনকি লাদাখের মতো স্থানেও প্রচুর মানুষ ঘুরতে যাচ্ছে। ঠিক স্পিটি ভ্যালিতেও এখন অনেকেই ঘুরতে যাচ্ছে।স্পিটি ভ্যালি মানে হচ্ছে মধ্যম ভূমি অর্থাৎ ভারত ও তীব্বতের মাঝখানে অবস্থিত। শিমলা থেকে প্রায় ৪১৫ কিমি এবং মানালি থেকে ২০০ কিমি দূরে অবস্থিত।এই এরিয়াতে মূলত তীব্বতীদের বসবাসের পরিমাণ বেশি, একদম চায়নার পাশেই অবস্থিত। এখানে যেতে হলে আপনার আলাদা পারমিশন নিতে হবে অর্থাৎ চাইলেই যেতে পারবেন না অনুমতি ছাড়া। তবে এই অনুমতি পাওয়া খুব সহজ। তেমন কোন ঝামেলা নেই।

২০১৮ সাল থেকে বিদেশীদের জন্য রেস্ট্রিকশন উঠিয়ে দিয়ে যাতায়াতের ব্যবস্থা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তাই অনেক ফ্যামিলিও সেখানে ঘুরতে যাচ্ছে। তবে ফ্যামিলি নিয় ঘুরতে যাওয়ার আগে কিছু বিষয় অবশ্যই আগে থেকে জেনে রাখা উচিত কারণ এটি আর অন্য স্পটের মতো নয়, সম্পূর্ণ আলাদা একটা দূর্গম এরিয়া তাই আপনাকে যে সব বিষয়ের উপর জেনে রাখা উচিত।

স্পিটি ভ্যালি কে বরফের মরুভূমি বলা হয়ে থাকে। এটি ১২ মাসের ৬ মাস সম্পূর্ণ বরফে আচ্ছান্ন থাকে এবং মাস গুলি বরফে আচ্ছান্ন না থাকলেও বিকেলের পর থেকে প্রচন্ড ঠান্ডা থাকে। প্রচন্ড সরু রাস্তা তাই ২ টা গাড়ি যাওয়া আসা করা সো টাফ হয়ে যায়। খুব বেশি লোক এখানে বসবাস করে না তাই অহরহ মানুষের আনাগোনা দেখতে পারবেন না অর্থাৎ বাজার এলাকা ছাড়া রাস্তাঘাটে খুব বেশি লোকজন দেখা যায়না।

কিছু বিষয়ের উপর যথেষ্ট জ্ঞান না থাকলে বা না জানা থাকলে আপনার ভ্রমণ এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। তো চলুন শুরু করি কি কি বিষয় জানা থাকা বা প্রস্তুতি থাকা উচিত—

মাউন্টেইনে তীব্র অসুস্থবোধ হতে পারে?

কাজা (Kaza) হচ্ছে স্পিটি ভ্যালির মূল কেন্দ্র বা হেড কোয়ার্টার এবং এর উচ্চতা প্রায় ১২৫০০ ফুট আবার চন্দরাতলের উচ্চতা ১৪১০০ ফুট। অন্যদিকে এই রুটের সবচেয়ে বড় দুটি উঁচু পাসিং এরিয়ার একটি হচ্ছে রোথাং পাস যার উচ্চতা ১৩০৫৮ ফুট এবং অন্যটি হচ্ছে কুঞ্জুম পাস যার উচ্চতা ১৫০৬০ ফুট।

আমি বলতে চাচ্ছি যে এরকম উঁচু পাহাড়ের উপর আগে কখনো হয়তো আপনি ফ্যামিলি নিয়ে যাতায়াত করেন নাই যার কারণে কিছুটা অসস্তিবোধ শুরু হতে পারে। এতো উঁচু হিলে যখন যাবেন তখন আপনার মাথা ম্যাথা, মাথা ঘোরা এবং শ্বাসকষ্ট হতে পারে যা একদমই স্বাভাবিক।

বিশেষ করে আপনি যখন চন্দরাতল লেক যাবেন তখন এই ধরনের সমস্যা হরহামেশাই ঘটে থাকে তবে আপনার যদি পূর্বে উঁচু হিলে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস থাকে যেমন দার্জিলিং, জজিলা পাস বা মানালির উঁচু হিল সেক্ষেত্রে কিছুটা রিলিফ পেতে পারেন তবুও হতে পারে এটা ধরে রাখতে হবে যেহেতু আপনার রেগুলার যাতায়াত নয়।

নিচের লিংক থেকে উঁচু পাহাড়ে উঠার পর অসুস্থতায় ভুগলে কি কি করতে হবে বিস্তারিত জানতে পারবেন

ভুল করেও কোলের বাচ্চা নিয়ে এখানে যাবেন না?

আপনার বাচ্চার বয়স যদি ১ বছরের কম হয় তাহলে তাকে নিয়ে মোটেও স্পিটি ভ্যালি যাওয়ার চিন্তা করবেন না। কারণ এতো উঁচু হলে বাচ্চাদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে যা নিতে সহ্য করতে পারবে না এবং আপনার ভ্রমণের আনন্দ একদম মাটি হয়ে যাবে। এমনকি বাচ্চার বয়স যদি ৩/৪ বছর হয় তবুও না যাওয়া বেটার।কারণ আপনার বাচ্চা যদি কোন কারণে কান্নাকাটি করে এবং কেন কাদছে সেটা যদি আপনার সামনে এক্সপ্রেস করতে না পারে তাহলে ভয়ানক অবস্থা হতে যাচ্ছে যা হয়তো আপনার ধারণার বাইরে। তাছাড়া স্পিটি ভ্যালি ভিন্ন একটি জায়গা, সেখানে যখন তখন ডাক্তার বা ভালো মানের চিকিৎসা পাবেন না।

তাই আমার পরামর্শ হচ্ছে বাচ্চা যাতে আপনার সামনে তার ভালো বা খারাপ লাগা যদি এক্সপ্রেস করতে পারে তবেই বাচ্চা নিয়ে ভ্রমণ করতে পারেন। এক্ষেত্রে বাচ্চার বয়স অন্তত ৪/৫ বছর হলে এই সুবিধা বাচ্চার থেকে আশা করতে পারেন, এর নিচে খুব কঠিন তাই ভ্রমণের ইচ্ছা থাকলেও সেটা বাচ্চার বয়স ৪/৫ বছর না হওয়া পর্যন্ত এই রুট ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ।

জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে ভ্রমণ করুন

আপনি যেহেতু ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে যাবেন এবং সাথে হয়তো ওয়াইফ বা বাচ্চা থাকতে পারে তাই আপনার ভ্রমণ অবশ্যই জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে হওয়া উচিত। এই সময়ের বাতাসের অবস্থা দারুন। বিশেষ করে জুন বা সেপ্টেম্বর মাসে ভ্রমণ করলে বৃষ্টির সিজন তেমন পাবেন না এক্ষেত্রে রাস্তা ঘাট ভালো থাকে কারণ বৃষ্টি হলে রাস্তা ঘাট চরম বাজে হয়ে যায় এক্ষেত্রে গাড়ি থেকে অনেক স্থানে নামা লাগতে পারে।তাই এই সময়ে ফ্যামিলি নিয়ে ঘোরার জন্য বেস্ট।

জুন থেকে সেপ্টেম্বর বাদে অন্য সমস্ত মাসে ভ্রমণ করা বিপদজনক কারণ প্রচন্ড ঠান্ডা ও বরফে আচ্ছান্ন থাকে তাই ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে চাইলে এতো ঠান্ডার মধ্যে ঘুরতে না যাওয়া বেটার কারণ এই সময়ে স্পিটি ভ্যালির ৯৮% হোটেল বন্ধ থাকে যেমন অক্টোবর মাস থেকে ৯৫% হোটেল বন্ধ হয়ে যায়। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে ৯৯% হোটেল বন্ধ থাকে অর্থাৎ ভাগ্য ভালো থাকলে দু একটা খোলা পেতে পারেন।

এসময়ে তাপমাত্রা মাইনাস ২৫ ডিগ্রী পর্যন্ত হয়ে থাকে তাই ফ্যামিলি নিয়ে এই সময়ে ঘোরাঘুরি বাদ দেওয়া উচিত তবে ভারতের অন্যসব স্থানে ঘুরতে পারবেন যেমন দিল্লি-আগ্রা-রাজস্থান ও বরফে আচ্ছান্ন নয় এমন সব স্থানে ঘুরে আসতে পারেন।

স্পিটি ভ্যালিতে মেডিকেলের অবস্থা?

একমাত্র ডাক্তার ই আপনাকে ভালো পরামর্শ দিতে পারবে অর্থাৎ আপনি উঁচু পাহাড়ে ঘোরার জন্য উপযুক্ত কিনা। তবে আপনার যদি হার্ট সমস্যা থাকে এবং আ্যজমা রিলেটেড সমস্যা খুব আকারে থাকে তাহলে এতো উঁচু পাহাড়ে ঘুরতে না যাওয়া আপনার জন্য বেটার কারণ এতে রিস্ক থাকে। ওখানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে ভালো মানের ডাক্তার পাওয়া কঠিন যেহেতু দূর্গম এরিয়া তাই এই বিষয়টি ভাবা উচিত।আপনার শিশুর যদি ঠান্ডা জনিত কোন সমস্যা থাকে বা হার্ট রিলেটেড কোন সমস্যা থাকে তাহলে স্পিটি ভ্যালি ভ্রমণ থেকে বিরত থাকা উচিত, এমনকি বাচ্চার বয়স যদি ৮/১০ বছর হয় তবুও বিরত থাকা উচিত।

ভ্রমণের সময় কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধ নিন

যেহেতু আপনি ভিন্ন একটি দূর্গম ও উঁচু পাহাড়ি শহরে ঘুরতে যাচ্ছেন তাই যাওয়ার সময় সাথে কিছু ব্যাসিক ওষুধ সাথে রাখবেন যেমন মাথা ম্যাথার জন্য, ঠান্ডা জনিত সমস্যার জন্য, হালকা জ্বর হলে, নাকের ড্রপ ওরস্যালাইন। এই সব রিলেটেড ব্যাসিক ওষুধ সাথে নিতে পারেন যেসব ওষুধে তেমন সাইডইফেক্ট হয়না তবুও ভ্রমণের আগে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত বলে মনে করছি। এসব ওষুধ সাথে থাকলে আপনি যথেষ্ট পরিমাণ হেল্প পাবেন। এছাড়া সূর্যের তাপমাত্রা থেকে বাঁচার জন্য আপনি সান প্রটেক্টেড কোন লোশন নিতে পারেন যে লোশন আপনার শরীরের জন্য পারফেক্ট। অবশ্যই সানগ্লাস নিতে মোটেও ভুলবেন, এতে আপনার চোখ যথেষ্ট সুরক্ষা দিবে।

শিমলা থেকে যাত্রা শুরু করবেন কিভাবে?

যেহেতু আপনি ফ্যামিলি নিয়ে ভ্রমণ করবেন তাই শিমলা থেকে যাত্রা শুরু করা উচিত কারণ এই দিক দিয়ে খুব বেশি উঁচু হিল নেই যা মানালি সাইড দিয়ে যাত্রা করলে রোথাং ও কুঞ্জুম পাস পাবেন। কারণ যাত্রা পথে যদি উঁচু হিল পাসিং হয়ে যান এবং কোন কারণে অসুস্থ হয়ে গেলে পুরো ভ্রমণ মাটি হয়ে যাবে তাই শিমলা দিয়ে শুরু করবেন এবং মানালি সাইড দিয়ে শেষ করবেন। শিমলা সাইড দিয়ে ভ্রমণের সময় অন্তত ২ রাত বিভিন্ন স্থানে থাকার দরকার হবে তাই খারাপ লাগার কোন কারণ নেই অর্থাৎ যথেষ্ট রেস্ট পাবেন। শিমলা সাইড দিয়ে প্রায় ৪১৫ কিমি দূরে এবং মানালি সাইড দিয়ে প্রায় ২০০ কিমি দূরে অবস্থিত। আশা করি এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হবে না।

একটু ধীরে ধীরে ভ্রমণ করুন

যেহেতু ফ্যামিলি নিয়ে ভ্রমণ করতে যাচ্ছেন সাথে চাইল্ড বা বাবা-মা থাকতে পারে সেজন্য একটানা ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন অর্থাৎ একটানা ৪১৫ কিমি ভ্রমণ খুব টাফ যেহেতু পাহাড়ি রাস্তা, ইচ্ছামতো জোরে গাড়ি বা কার চালানো সম্ভব নয়। তাছাড়া স্পিটি ভ্যালি একটানা যেতে অন্তত ২৪/২৫ ঘন্টা সময় লাগে। আপনি যে বাস বা কারে যাবেন তার গড় গতি ২৫ থেকে ৩০ কিমি এর বেশি হবে না। সেজন্য ১০০/১২০ কিমি যাওয়ার পর কোথাও থামুন এবং সেখানকার কোন হোটেলে রাতে থাকুন। এছাড়া যাওয়ার পথে কিছু এরিয়া আছে যা না দেখা হলে স্পিটি ভ্যালি ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

বিশেষ করে কালপা, সাংলা, নাকো এসব এরিয়াতে রাতে থাকুন এবং আশেপাশে ঘুরুন তারপর স্পিটি ভ্যালির উদ্দেশ্যে পরের দিন রওনা দিন। ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছেন তাই শিমলা থেকে একবারই প্রাইভেট কার ভাড়া করে নিন। প্রয়োজনে শিমলা টু কাযা পর্যন্ত ভাড়া করুন অথবা শিমলা টু কাযা টু মানালি পর্যন্ত ভাড়া করুন এবং ভাড়া করার সময় ড্রাইভারকে বলুন যে আপনি অন্তত যাত্রাপথে ৩ রাত এবং কাযাতে অন্তত ২ রাত থাকবেন অথবা আপনার যে কয় রাত থাকতে ইচ্ছা হয়। তাহলে ড্রাইভারেরও ভাড়া বলতে সুবিধা হবে।

রাতে কি চন্দরাতল লেকে থাকবেন?

মোটেও না। চন্দরাতলে দেখার মতো বলতে শুধুই লেক আছে তাই ছাড়া আর কিছুই নাই তবে এটি মূলত ক্যাম্পেইন করে থাকার জন্য, অন্যরকম আনন্দ তবে সেটি ফ্যামিলি নিয়ে মোটেও নয়। এখানে রাতের বেলা জিরো ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা হয়ে থাকে সেটা মে বা জুন বা জুলাই যে মাসেই যান না কেন তাই ফ্যামিলির জন্য এখানে থাকা খুব কঠিন তবে কাপল বা ফ্রেন্ড হলে তেমন কোন সমস্যা নেই। এখানে ঘুরতে চাইলে কাজা (Kaza) ঘুরাঘুরি করে তারপর দিনের দিন চন্দরাতল ঘুরে মানালি চলে যাবেন অর্থাৎ রানিং অবস্থায় ঘুরতে পারেন অর্থাৎ চোখের দেখা আর কি।

ওখানে গিয়ে ১ ঘন্টা পর পর পানি খেতে পারেন এবং সাথে সব সময় ২/৩ লিটার পানি রাখবেন, যেখানে সেখানে পানি পাবেন না। সাথে কিছু চকলেট রাখুন এবং মিস্টি টাইপের বিস্কুট রাখুন যাতে ক্ষুদা লাগলে প্রয়োজন মেটাতে পারেন। লং ভ্রমণের সময় কখনো ভারি কোন খাবার খেয়ে বের হওয়া উচিত নয় কারণ পেটে সমস্যা হতে পারে, বমি আসতে পারে।

এক্ষেত্রে অবশ্যই হালকা খাবার খেয়ে বের হবেন যাতে ৪/৫ ঘন্টার মধ্যে পেটে কোন সমস্যা দেখা না দেয়। সাথে কিছু ফ্রেশ ফলমূল রাখুন। অনেকে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় জম্মের খাওয়া খেয়ে বের হয় এবং রাস্তাঘাটে বিপদে পড়ে। এই বিষয়টি আমি খুবই গুরুত্ব দেয় কারণ ভ্রমণের সময় যদি অসস্তি লাগে তাহলে সেই ভ্রমণ কখনো মনের মতো আর হয়ে ওঠে না। আমি যখন বাসা থেকে বের হই ঘোরার উদ্দেশ্য নিয়ে তখন জাস্ট কয়েক গ্লাস পানি খেয়ে নেই যাতে ৩/৪ ঘন্টার মধ্যে খুব বেশি ক্ষুদা না লাগে তারপর কোন জায়গা গিয়ে থেমে শান্তি মতো খেয়ে নেই।

ভ্রমণের সময় চাইল্ডের দিকে খেয়াল রাখুন

খুব উঁচু পাহাড়ে ভ্রমণের সময় সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়ে থাকে ক্লান্ত কারণ ধীরে ধীরে যত উপরের দিকে যাবেন ততোই খারাপ রাস্তার দেখা পাবেন, কিছুটা ঝাকিতো সহ্য করতে হবে। মোটামুটি আপনি দীর্ঘ সময় পর কিছুটা ক্লান্ত হয়ে যাবেন। অনেক উঁচুতে যাওয়ার পর আপনার বাচ্চা কিছুটা অসস্তিবোধ করবে। মাঝে মাঝে আপনার বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করতে হবে, যদি খারাপ লাগে তাহলে কাছাকাছি কোন হোটেলে চেকইন করতে হবে কারণ আপনার বাচ্চার মূলত হাই হিলের কারণে খারাপ লাগছে সেক্ষেত্রে মোটেও বেশিদূর যাওয়া ঠিক হবে না, অবশ্যই ড্রাইভারকে বলুন যে গাড়ি থামাতে, ২০/২৫ মিনিট থেমে একটু রেস্ট নিন তারপর সামনে এগিয়ে কোন হোটেলে উঠুন।

আপনার বাচ্চা যদি আপনাকে বলে তার মাথা ব্যাথা করছে, বমি ভাব আসছে, এমনকি পানি পর্যন্ত খেতে তার অনীহ তাহলে বুঝবেন হাই হিলের কারণে এটি ঘটছে তাই দ্রুত হোটেলে চেকইন করুন, রেস্ট নিন, দরকার হলে রাতে থাকুন এবং পরের দিন আবার রওনা দিন। মনে রাখবেন আপনার বাচ্চার বিষয়টি গুরত্ব না দিলে বড় ধরনের বিপদের সম্মুখীন হবেন, এতে কোন সন্দেহ নেই। আশা করছি বাচ্চার ক্ষেত্রে আমার এই পরামর্শ গ্রহণ করবেন। সাথে টয়লেট পেপারস রাখুন কারণ অনেক হোটেলে হয়তো এটি নাও পেতে পারেন তাই নিজেদের দরকারে এসব জিনিস সাথে রাখুন।

কিভাবে হোটেল বুকিং করবেন?

আপনি যখন একা ভ্রমণ করবেন তখন হয়তো অগ্রীম হোটেল বুকিং এর দরকার হয়না কারণ সরাসরি হোটেলে গিয়ে বুকিং করা যায়, রুমের কন্ডিশন মোটামুটি হলেও সমস্যা নেই কিন্তু পরিবার নিয়ে ভ্রমণের সময় এটা খুবই কঠিন। আপনি ফ্যামিলিকে রেখে হোটেল দেখাদেখি করা কিছুটা বোরিং ও সময় নস্ট। আপনি যে এরিয়াতে রাত কাটাতে চাচ্ছেন সেই এরিয়াতে নিশ্চয়ই ভালো মানের হোটেল আছে, গুগলে একটু সার্স করলে পেয়ে যাবেন।এমনকি চাইলে goibibo থেকেও সার্স করে ভালো মানের হোটেল বুকিং দিতে পারবেন। হোটেলের ছবি, বাথরুম ছবি, আউটলুক দেখলে কিছুটা ধারণা পাবেন।

যেহেতু সাথে আপনার বাচ্চা, ওয়াইফ বা বাবা-মা থাকবে তাই অগ্রীম হোটেল বুকিং করে যাওয়া উচিত নতুবা ওখানে উপস্থিত হয়ে মনের মতো হোটেল নাও পেতে পারেন। অনেক হোটেলে ফ্যামিলি রুম বা ভালো মানের সুপার ডিলাক্স রুম পাবেন যার ভাড়া প্রতিরাত ১৫০০/২০০০ রুপির মধ্যে পেয়ে যাবেন বা আরো কমের মধ্যেও পেতে পারেন সিজন ভেদে।

ট্রেনে কি ধরণের সিট বুকিং দিবেন?

যেহেতু ফ্যামিলি ভ্রমণ করবেন এবং ভ্রমণ যদি ট্রেনে করতে ইচ্ছুক হোন তাহলে অবশ্যই এসি স্লিপার সিট বুকিং দিবেন সেটা 3A or 2A টায়ার টাইপের সিট। 3A টায়ার বগিতে এক কেবিনে ৮ টি করে এসি স্লিপার সিট থাকে অর্থাৎ উপরে, মাঝে, নিচে এভাবে ৬ টি এবং যাতায়াতের জন্য ২ ফুটের মতো রাস্তা থাকে এবং তারপাশে জানার পাশে অর্থাৎ নিচে একটি এবং উপরে একটি সিট থাকে। এই ধরণের সিটে গায়ে দেওয়ার জন্য চাদর, বিছানোর চাদর, একটি বালিশ, একটি তোয়ালে দেওয়া হয় তাই আরামদায়ক বটে।

আবার আপনি যদি 2A টায়ার বগিতে ভ্রমণ করতে চান তাহলে এক কেবিনে ৪টি স্লিপার সিট থাকে অর্থাৎ উপরে দুটি এবং নিচে দুটি। মাঝে কোন সিট থাকে না এবং পরদা দেওয়া থাকে। ঠিক পাশে আরো দুটি উপরে ও নিচে সিট থাকে এবং পরদা দেওয়া থাকে অর্থাৎ এক কেবিনে এক সাথে ৪টি এবং অন্যপাশে দুটি সিট থাকে। 2A টায়ার সিট তুলনামূলক একটু আরামদায়ক যেহেতু মাঝে কোন সিট থাকে না এবং 3A টায়ারের তুলনায় 2A টায়ার সিট কিছুটা চওড়া বেশি অর্থাৎ প্রায় দেড় ইঞ্চি চওড়া বেশি থাকে। সমস্ত কেবিনে মোবাইল ও ল্যাপটপ চার্জ দেওয়ার পয়েন্ট থাকে।

কলকাতা থেকে ট্রেন কখন ছাড়ে?

ধরে নিচ্ছি, আপনি কলকাতা থেকে ট্রেনে করে রওনা দিবেন সেক্ষেত্রে কলকাতা থেকে কালকা স্টেশনে যাওয়ার ট্রেনে উঠতে হবে। প্রতিদিন মাত্র একটি ট্রেন কলকাতা থেকে কালকার উদ্দেশ্যে ছাড়ে এবং প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭ টা ৪০ মিনিটে হাওড়া স্টেশন থেকে ছাড়ে। মূলত স্পিটি ভ্যালি যেতে হলে আপনাকে শিমলা বা মানালি হয়ে যেতে হবে। যেহেতু আপনি ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে যাবেন তাই শিমলা সাইড দিয়ে যাওয়া বেটার। সেক্ষেত্রে আপনাকে কালকা স্টেশনে পৌঁছাতে হবে। কালকা পৌঁছাতে অন্তত ৩৩/৩৪ ঘন্টা সময় লাগে এবং ভোর ৫ টার একটু আগে পৌঁছায়। কালকা পৌঁছানোর পর কালকা টু শিমলা যাওয়ার জন্য টয় ট্রেন পাওয়া যায়। আপনি চাইলে ব্রিটিশ আমলের তৈরি টয় ট্রেনে করে শিমলা যেতে পারেন এক্ষেত্রে ৭ ঘন্টার মতো সময় লাগে এবং কালকা থেকে সকাল ৫ টা ৪৫ মিনিটে ছাড়ে, শিমলা গিয়ে পৌঁছায় দুপুর ১ টার মধ্যে।

ট্রেনে ভাড়া কেমন?

যেহেতু শিমলা হয়ে যেতে হবে তাই কলকাতা থেকে সরাসরি কালকা পর্যন্ত যেতে পারেন কালকা মেইল ট্রেনে এবং এসি 3A tier সিটের ভাড়া প্রতিজন বাবদ ১৯০০ রুপি এবং 2A tier এর ভাড়া প্রতিজন বাবদ ২৫৫০ রুপি করে।আবার কলকাতা থেকে শিমলা চেয়ার কোচ টাইপের সিট থাকে, এখানে কোন স্লিপার সিট থাকে না। এই টাইপের সিটের ভাড়া প্রতিজন বাবদ ৫৫০/৬৫০ রুপি করে। এই টাইপের সিট নিলে সকালের ব্রেকফাস্ট সহ।

আমি কি দিল্লি হয়ে যেতে পারবো?

কলকাতা থেকে দিল্লি হয়েও যেতে পারেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই রাজধানী/দূরন্ত এক্সপ্রেস ট্রেনে যাওয়া উচিত কারণ ফ্যামিলি ভ্রমণের জন্য এই দুটি ট্রেন নিট এ্যান্ড ক্লিন, দ্রুতগামী এবং খাবার সহ। তাই এই ট্রেনে গেলে মনে রাখার মতো ভ্রমণ হবে। ট্রেন দুটি কলকাতা থেকে বিকেল ৪ টা ৫০ মিনিটে ছাড়ে। একটি ছাড়ে শিয়ালদাহ স্টেশন থেকে এবং অন্যটি ছাড়ে হাওড়া স্টেশন থেকে কিন্তু একই সময়ে ছাড়ে। দিল্লি গিয়ে পৌঁছায় পরের দিন সকাল ১১ টার মধ্যে বা হায়েস্ট ১২ টার মধ্যে যদি কোন সমস্যা না হয়।

এই ট্রেনের ভাড়া প্রতিজন ২৯০০/৩০০০ রুপি খাবার সহ যেহেতু দ্রুতগামী ট্রেন তাই ভাড়াও অনেক বেশি কিন্তু আরামদায়ক ট্রেন। এই ভাড়া মূলত 3A টায়ার সিটের জন্য প্রযোজ্য আর 2A tier ভাড়া প্রতিজন প্রায় ৩৮০০/৪০০০ রুপি। এই ট্রেনের ভাড়া প্লেনের মতো আপ-ডাউন হয়ে থাকে। যদি ২ মাস আগে বুকিং করা যায় তখন 3A tier সিটের ভাড়া ২২০০/২৪০০ রুপির মধ্যে সম্ভব তবে ২৯০০/৩০০০ রুপি ধরে রাখতে হবে কারণ সব সময় ভাড়া আপনার অনুকূলে থাকে না।

দিল্লি থেকে কিভাবে যাবেন?

কলকাতা থেকে দিল্লিতে রাজধানী/দূরন্ত এক্সপ্রেসে যদি যান তাহলে দিল্লি গিয়ে সকাল ১১/১২ টার মধ্যে পৌঁছাবেন এবং দিল্লি থেকে সরাসরি শিমলা যাওয়ার প্রাইভেট কার ভাড়া করতে পারেন অথবা দিল্লি এক রাত থেকে পরের দিন রওনা দিতে পারেন যেহেতু ফ্যামিলি নিয়ে যাবেন তাই কিছুটা রিলাক্স ভ্রমণের চিন্তা করবেন।

দিল্লি থেকে ট্রেনে কিভাবে যাওয়া সম্ভব?

আপনি যদি দিল্লি থেকে ট্রেনে যেতে চান সেক্ষেত্রে দিল্লি পৌঁছায়ে ওই দিন হোটেলে অবস্থান করুন। পরের দিন সকালবেলার ট্রেনে করে কালকা পর্যন্ত যেতে পারবেন কারণ সরাসরি শিমলা যাওয়ার কোন ট্রেন নেই তাই কালকা পর্যন্ত গিয়ে আবার কালকা টু শিমলা টয় ট্রেনে করে যেতে হবে।

দিল্লি থেকে প্রাইভেট কারে যাওয়া সম্ভব?

আপনি দিল্লি থেকেও কার ভাড়া করে শিমলা বা স্পিটি ভ্যালি যেতে পারেন। এক্ষেত্রে কারে ভ্রমণ অনেকক্ষন ধরে চলতে থাকবে যা অনেকের জন্য বিরক্তিকর মনে হতে পারে তবে ৩/৪ ঘন্টা চলার পর ১০ মিনিটের গ্যাপ নিলে হয়তো খারাপ লাগবেনা। তবে সবচেয়ে ভালো হচ্ছে শিমলা বা চন্ডিগড় থেকে কার ভাড়া করলে বেটার কারণ ভাড়াও কিছুটা কমে পাবেন এবং এই এরিয়ার ড্রাইভার আরো বেশি এক্সপার্ট।

ট্রাভেল এজেন্সির সহায়তা নিতে পারেন

আপনি যদি কখনো একা ভ্রমণ করেন সেক্ষেত্রে ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে না যাওয়া বেটার। এক্ষেত্রে একা একা খোঁজ খবর নিয়ে রওনা দিন তবে ফ্যামিলি নিয়ে ভ্রমণে বের হলে সেক্ষেত্রে নিজেরা যদি ভ্রমণ প্লান করতে না পারেন বা সংশয় থাকে সেক্ষেত্রে এজেন্সির মাধ্যমে প্লান করিয়ে ঘুরে আসতে পারেন।

এক্ষেত্রে কিছুটা খরচ বেশি হতে পারে তবে নিরাপদ ভ্রমণ হবে। অবশ্যই ভালো মানের এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এজেন্সির সহায়তা নিন যাতে কোন প্রয়োজন হলে তারা আপনাকে দ্রুত হেল্প করতে আগ্রহী থাকে। কোন অনভিজ্ঞ ট্রাভেল এজেন্সির খপ্পরে পড়লে পুরো ফ্যামিলি ভ্রমণ মাটি হয়ে যাবে। যাদের মাধ্যমে ঘুরে আসতে চাচ্ছেন তাদের বিষয়ে খোঁজ নিন যেমন তাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট, রিভিউ এসব দেখলেই তাদের সম্পর্কে যথেষ্ট বুঝতে পারবেন।

ভ্রমণের সময় শ্যুটিং স্টন এরিয়া থেকে দূরে থাকুন

আপনি যখন ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে বের হবেন তখন বিভিন্ন স্থানে হয়তো নেমে অনেক ছবি তুলতে চাইবেন যা স্বাভাবিক। পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখে যে কারো মাথা হ্যাং হয়ে যেতে পারে আর বিশেষ করে স্পিটি ভ্যালি হলে তো কথায় নয়। যখন ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে যাবেন তখন শ্যুটিং স্টোন এরিয়াতে কোন ভাবেই নামবেন না।

শ্যুটিং স্টোন বলতে বোঝাচ্ছি পাহাড়ের উপর থেকে মাঝে মাঝে পাথর এসে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে। স্পিটি ভ্যালির দিকে যেতে এরকম কিছু স্পট ফিক্সড করা হয়েছে যেখানে মাঝে মাঝে বড় বড় পাথর খসে পড়ে আর তাই ওই সব এরিয়া যতোই সুন্দর হোক না কেন ছবি তোলার জন্য ড্রাইভারকে কখনো গাড়ি থামাতে বলবেন না। যদিও ড্রাইভাররা আরো বেশি সচেতন তবুও আপনার এই বিষয়টি মনে রাখতে হবে।

আশা করছি এতোক্ষনে ফ্যামিলি নিয়ে কিভাবে ঘুরতে যাবেন তার আদ্যোপান্ত জেনে গেছেন। প্লান করতেও সুবিধা হবে। এই বিষয়ে যদি আরো কোন প্রশ্ন থাকে তাহলে কমেন্টস বা মেসেজ করে জানান, দ্রুত রিপ্লাই দেওয়ার চেস্টা করবো ইনশাআল্লাহ। ভালো থাকুন।

লেখাঃ শেখ আব্দুর রহমান

ভ্রমণ হবে সহজে

"পরবর্তীতে পড়ার জন্য শেয়ার করে রাখুন"