চলুন Tawang – তাবাং (অরুনাচল) ঘুরে আসি। কত যে সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তাবাং এ, না গেলে বুঝবেন না। তাবাং যাওয়ার A to Z গাইডলাইন পড়ুন…

তাবাং মূলত অরুনাচল প্রদেশে অবস্থিত। এটি ভারতের উত্তরপশ্চিম দিকে অবস্থিত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০০০০ ফুট উপরে অবস্থিত যা হিল স্টেশন এরিয়া হিসেবে পরিচিত। তবে এই অরুনাচলে সবার যাওয়া সম্ভব নয় কারণ রেস্ট্রিকটেড এরিয়া এবং অরুনাচল প্রদেশের অধিকাংশ ভারতের সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রন করে।

এই এরিয়াতে ভারত ও চীনের সিমান্ত রয়েছে এবং ভুটান ও তিব্বত সীমান্তের সাথে অরুনাচলের তাবাং ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িয়ে আছে সেজন্য সেনাবাহিনীর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। এমনকি ভারতীয়দের তাবাং যেতে হলে আলাদা পারমিশন নিতে হয় এবং বিদেশীদের যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল কিন্তু সম্প্রতি কিছুটা রেস্ট্রিকশন কমিয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ যদি সেখানে ঘুরতে ইচ্ছুক থাকে তাহলে বাংলাদেশে অবস্থিত ঢাকাস্থ ভারতের এম্বাসি থেকে আলাদা পারমিশন নিতে হবে এবং এই পারমিশন পেতে অন্তত ১৫/২০ দিন পর্যন্ত লাগতে পারে কারণ পারমিশন দিল্লি থেকে দিবে।

এটি মূলত বৌদ্ধদের জন্য বিখ্যাত কারণ এখানে প্রায় ৪০০ জন+ বৌদ্ধ গুরু বসবাস করে এবং বৌদ্ধদের তীর্থস্থানও বলা যেতে পারে। এখান থেকে অনেক বৌদ্ধ দিক্ষা নিয়ে থাকে। তাবাং এ ১৪০০ সালের দিকে তৈরি করা বৌদ্ধ মন্দির রয়েছে যা পৃথিবীর মধ্যে ২য় বৌদ্ধ মন্দির এবং সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত।

আপনি যখন অরুনাচলে প্রবেশ করবেন তখন মনে হবে ভিন্ন এক গ্রহে চলে আসছেন কারণ কোন কোন সময় ১৫০০০ আবার কোন সময় ১৬০০০ ফুট উপরে চলে যাবেন এবং যেদিকে তাকাবেন পাহাড় আর পাহাড়। মাঝে মাঝে সাদা পাহাড় দেখতে পারবেন অর্থাৎ অরুনাচল প্রদেশে প্রচন্ড শীত থাকে তাই বরফে আচ্ছান্ন থাকে।

তাবাং এর ( Tawang) আবহাওয়ার অবস্থা কেমন?

তাবাং এ কয়েকমাস গরম থাকে এবং অধিকাংশ সময় প্রচন্ড শীত থাকে অর্থাৎ বরফে ঢাকা থাকে। সামান্য বৃষ্টি হয়ে থাকে। প্রতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত গরম থাকে তবে সেটি ২৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার মতো থাকে অর্থাৎ এর নিচে নামে না, খুব বেশি গরম নয়, অস্থির এক পরিবেশ থাকে এই সময়ে, না শীত, না গরম🤔

জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়ে থাকে তবে আমাদের এরিয়ার মতো ওতো ঘন ঘন নয় তবে প্রায় মেঘলা মেঘলা ভাব থাকে এই সময়ে।

সবচেয়ে বেশি ঠান্ডা থাকে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী লাস্ট পর্যন্ত। এই সময়ে মাইনাস (-১২/১৫ ডিগ্রী) সেলঃ তাপমাত্রা থাকে যা সহ্য করার মতো নয়। তবুও সেখানে অবস্থিত মানুষ অবলিলায় বসবাস করে যাচ্ছে, সবই অভ্যাসের ব্যাপার।

তাবাং ঘোরার জন্য কোন সময় বেস্ট হবে?

তাবাং ঘোরার জন্য বেস্ট সময় হচ্ছে Summer এবং Spring এর সময় কারণ এই সময়ে তাবাং এর চারিদিক সতেজ, প্রানবন্ত থাকে। পাহাড়ের চারিদিকে সবুজ আর সবুজ দেখতে পাওয়া যাবে। ঘোরার জন্য বেস্ট সময় হচ্ছে মার্চ, এপ্রিল, মে, জুন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাস।

তাবাং গিয়ে কি কি দেখবেন?

তাবাং এর সৌন্দর্য দেখে পাগল হয়ে যেতে পারেন তাই না যাওয়াই ভালো হবে😀 তবে যেতে চাইলে তো আর মানা করা সম্ভব নয় কারণ এরকম পাগল অনেকে হতে আগ্রহী। এমনকি সিংগেল বা কাপল বা গ্রুপ সিস্টেমে।
এখানে আছে ফ্রেশ ওয়াটার সাথে লেক, এতো উঁচু স্থানেও যে লেক থাকতে পারে, দেখার পর অবাক হতে হবে। পাহাড়ের ভিতর ভিন্ন এক জগতবাসির বসবাস।

Sela Pass এ অবস্থিত এই লেক। এই লেকটি শীতের সময় পুরোটা বরফে আচ্ছান্ন থাকে, কি অবাক হচ্ছেন? এটাই সত্য, দেখে মনে হবে, এখানে কোন লেকই নেই অথচ সেটি স্বাভাবিক তাপমাত্রার সময়ে পানিতে ভরপুর থাকে। তাবাং শহর থেকে দূরে অর্থাৎ ২ ঘণ্টা সময় লাগে Nuranang Falls পৌঁছাতে।

নদী, পাহাড় এবং ঝর্ণার এক অপরুপ সৌন্দর্য এই নুরানাং ফলস যা প্রায় ৩২৯ ফুট উচ্চতার এক বিশাল ঝর্ণা এবং তার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ভুটান থেকে আসা খরস্রোতা জাঙ নদী। এরপর #ওয়ার_মেমোরিয়াল দেখতে পারবেন যা ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের স্মৃতি এই ওয়ার মেমোরিয়ালে অবস্থিত। এছাড়াও আরো কিছু দেখার স্থাপনা আছে।

তাবাং (Tawang) ঘুরতে গেলে প্রথমে কি করতে হবে?

প্রথমে পাসপোর্ট করতে হবে (যদি কারো পাসপোর্ট না থাকে আর থাকলে দরকার নেই)। এখন ই-পাসপোর্ট চালু হয়েছে তাই ঘরে বসে সহজে অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন করে আপনার মনমতো তারিখ ও সময় ঠিক করে পাসপোর্ট অফিসে সাক্ষর ও ছবি তুলতে যাবেন আর যাদের রিনিউ করতে হবে তারাও একই নিয়মে ই-পাসপোর্ট এর জন্য আবেদন করুন তবে পুরাতনদের কোন পুলিশ ভেরিফিকেশন হবেনা।

ডিজিটাল MRP পাসপোর্ট এর যুগ শেষ হতে যাচ্ছে। এই www.epassport.gov.bd সাইটে প্রবেশ করে ৪৮ পৃষ্ঠা/৬৪ পৃষ্ঠা এবং ৫ বা ১০ বছরের মেয়াদের জন্য এপ্লাই/রিনিউ করতে পারবেন অর্থাৎ যেমন চাইবেন। পাসপোর্ট করতে সমস্যা হলে আমাদের ইনবক্স এ মেসেজ করবেন, আমরা হেল্প করবো ইন শা আল্লাহ।

৫ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট এর জন্য ৪০৫২ টাকা এবং ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট এর জন্য ৬০০০ টাকা খরচ হতে পারে পাসপোর্ট এর পৃষ্ঠা অনুযায়ী। আপনি কত পাতার করতে ইচ্ছুক সেটা আপনার ব্যাপার যেমন প্রতি বছর এক বার ভারত/অন্য দেশে ঘুরতে ইচ্ছুক হলে ১০ বছর ও ৪৮ পাতার করলেই যথেষ্ট কিন্তু প্রতি বছর ২/৩ বার করে ভারত/অন্য কোন দেশে ঘুরতে ইচ্ছুক হলে সেক্ষেত্রে ১০ বছর ও ৬৪ পাতার করতে পারেন, তবুও এটি আপনার স্বাধীনতা, আমরা শুধু পরামর্শ দিলাম মাত্র।

ধরে নিলাম, আপনার পাসপোর্ট হয়ে গেছে বা রেডি আছে তারপর ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। আপনার বিভাগীয় শহরে ভারতীয় ভিসা অফিসে গিয়ে আবেদন করুন। যদি ভিসা আবেদন করতে না বুঝে থাকেন তাহলে আমরাতো আছি।

ভিসা ফি ৮২৪ টাকা এবং ভিসা এপ্লিকেশন যদি নিজে করেন তাহলে আর কোন টাকা লাগবেনা কিন্তু কোন এজেন্সির সহায়তা নিলে এক্সট্রা ৩০০ টাকা ধরে রাখুন। এক্ষেত্রে মোট ১১২৪ টাকার মতো ভিসা বাবদ খরচ হবে এর সাথে ভিসা অফিসে যাতায়াত বাবদ যা লাগে। এক্ষেত্রে আমাদের হেল্প নিতে পারেন। আমরা অনলাইন এপ্লিকেশন ও সঠিক প্রসেসিং এ সাহায্য করবো।

যাহোক পাসপোর্ট ও ট্যুরিস্ট ভিসা দুটোই এখন প্রস্তুত আছে। এখন অরুনাচল প্রদেশে ঘুরতে গেলে আবারো ভিসা অফিসে গিয়ে এক্সট্রা অনুমতির জন্য পাসপোর্ট রেখে আসুন সাথে পারমিশনের জন্য আবেদন করে আসুন। পারমিশনের জন্য এক্সট্রা ৩০০ টাকা ফি জমা দিতে হবে। এক্ষেত্রে পারমিশন পেতে অন্তত ২০/২৫ দিন অপেক্ষা করতে হবে আবার কম সময়ও লাগতে পারে।

পারমিশন পেতেও পারেন আবার নাও পেতে পারেন। এটা সম্পূর্ণ এম্বাসির উপর নির্ভর করবে, তাই হবেই এটা আশা করে থাকবেন না প্লিজ। ধরে নিলাম এই পারমিশনও আপনি পেয়ে গেলেন। এক্ষেত্রে কাপল/ফ্যামিলিদের কেন জানি দ্রুত পারমিশন দিয়ে থাকে।
এখন ভ্রমণের জন্য তো কিছু টাকা গুছিয়ে রাখুন। কারণ সব কিছু প্রস্তুত।

ঢাকা থেকে কিভাবে যাত্রা শুরু করবো?

কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে রাত ১১ টা ১৫ মিনিটে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে করে আসবেন এবং পরের দিন সকাল ৯ টার আগে বেনাপোল স্টেশনে পৌঁছে যাবেন। নন এসি চেয়ার কোচের ভাড়া ৫২৫ টাকা, এসি চেয়ার কোচ সিটের ভাড়া ১০০০ টাকা প্রতিজন। এই ট্রেনটি আমার কাছে বেস্ট মনে হয়েছে কারণ ছাড়ার টাইমিং ও পৌঁছানোর টাইমিং যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত। ভারতে যাতে অল্প খরচে সহজে যাতায়াত করতে পারে সেজন্য এই ট্রেনটি ২০১৯ সালে চালু করেছিল এবং বেশ সাড়া পেয়েছে। অন্তত যাত্রা শুরুর ৬/৭ দিন আগে বুকিং করলে টিকিট পাবেন নতুবা পাওয়া সো টাফ।

বেনাপোল স্টেশনে নেমে বহু ইজিবাইক পাবেন। এই ইজিবাইকে করে বেনাপোল বর্ডারে যাবেন, ভাড়া নিবে প্রতিজন ১০ রুপি করে তবে Corona পরবর্তী সময়ে হয়তো ভাড়া বেড়ে ১৫ টাকা হতে পারে। বর্ডারে পৌঁছে যাবেন ১০/১৫ মিনিটের মধ্যে, মাত্র ২ কিমি দূরে অবস্থিত এবং গেটের সাথেই সোনালি ব্যাংক কাউন্টার পাবেন। ওখান থেকে ট্রাভেল ট্যাক্সসহ ৫৫০ টাকা জমা দিয়ে জমা স্লিপ নিন অথবা যাত্রা শুরুর ৩/৪ দিন আগে অনলাইনের মাধ্যমে ট্রাভেল ট্যাক্স দিয়ে জমা স্লিপ প্রিন্ট করে সাথে রাখুন এক্ষেত্রে ৫০০ টাকা ট্রাভেল ট্যাক্স আর বেনাপোল উন্নয়ন ফি বাবদ ৫০ টাকা এটি আলাদা ভাবে বেনাপোল এ জমা দিতে হবে।

বেনাপোল পোর্ট পার হওয়ার পর অটোতে করে বনগাঁ স্টেশনে যাবেন, ভাড়া প্রতিজন ৩০ রুপি করে নিবে আর সময় লাগবে ২০/২৫ মিনিটের মতো। এরপর বনগাঁ স্টেশন থেকে ২০ রুপি দিয়ে টিকিট কেটে শিয়ালদা স্টেশনে নামবেন অর্থাৎ বনগাঁ লোকাল ট্রেন শিয়ালদাহ গিয়ে গন্তব্য শেষ হবে এবং সময় লাগবে ২ ঘন্টা ২০ মিনিটের মতো, টাইম ফিক্সড তাই এর থেকে বেশি সময় লাগবে না।

শিয়ালদাহ থেকে তাবাং (Tawang) কিভাবে যাবো?

তাবাং হচ্ছে অরুনাচল প্রদেশের একটি হিল এরিয়া এবং এখানে যেতে হলে আপনাকে মেঘালয়ে যেতে হবে অর্থাৎ গুয়াহাটি স্টেশনে নামতে হবে। শিয়ালদা থেকে গুয়াহাটি প্রতিদিন ট্রেন যাতায়াত করে থাকে। বিকেল বা সন্ধ্যা বা রাতে ট্রেন আছে এবং গুয়াহাটি গিয়ে পরের দিন সকাল ৮/৯ টার দিকে নামবেন।

অধিকাংশ ট্রেনের এসি স্লিপারের ভাড়া ১৩০০/১৪০০ রুপি, নন এসি স্লিপারের ভাড়া ৪৫০/৫০০ রুপি নিবে।

গুয়াহাটি স্টেশন নেমে এরপর কোথায় যাবো?

গুয়াহাটি নেমে এরপর আপনাকে তাবাং যেতে হলে অবশ্যই Tezpur যেতে হবে বাসে করে। কারণ গুয়াহাটি রাত যাপন না করে ১৮০ কিমি এগিয়ে থাকুন অর্থাৎ তেজপুর সিটিতে পৌঁছে সেখানকার কোন হোটেলে উঠুন এবং ১ রাত থাকুন কারণ একটানা ভ্রমণে চরম ক্লান্তিভাব এবং বোরিং হতে পারে তাই রাতে কোথাও থাকা উত্তম।

পরদিন ভোরবেলা ফ্রেশ হয়ে Tezpur থেকে Bomdila যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিন। তেজপুর থেকে বোমডিলার দূরত্ব প্রায় ১০৩ কিমি এবং সময় লাগবে প্রায় ৪ ঘন্টার মতো। প্রায় ৮০০০ ফুট উপরে বোমডিলা অবস্থিত, অসাধারণ এক পাহাড়ি পরিবেশ।

বোমডিলা পৌঁছে সেখানেও একরাত থাকুন এবং সময় থাকলে আশেপাশে ঘুরুন। পরের দিন সকালবেলা তাবাং যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিন। লোকাল বাস আছে, চাইলে বাসে অথবা সুমো টাটাতে যেতে পারেন বা প্রাইভেট Car এ। এখান থেকে তাবাং এর দূরত্ব প্রায় ১৮৫ কিমি পথ। সম্পূর্ণ পথ পাহাড়ি রাস্তা তাই যেতে সময় লাগবে অন্তত ৭/৮ ঘন্টার মতো। মাঝে মাঝে “চা” বিরতি পাবেন ১০/১৫ মিনিটের জন্য।

তাবাং যখন পৌঁছাবেন তখন প্রায় ১১৫০০+ ফুট উপরে চলে যাবেন। মনে হবে ভিন্ন কোন গ্রহে চলে আসছেন। আকাশ, পাহাড় একাকার হয়ে আছে।

ওখানে পৌঁছায়ে অন্তত ২ রাত বা ৩ রাত থাকতে পারেন তারপর মনমতো আশেপাশে ঘুরে বেড়ান। তারপর একই প্রক্রিয়ায় গুয়াহাটি ব্যাক করুন এবং কলকাতা ব্যাক করুন এবং দেশে ফিরুন।

চলবে……..

ওয়েবঃ www.bdindi-traverra.com
ব্যাপক তথ্য পেতে সাইট ভিজিট করুন

লেখাঃ শেখ আব্দুর রহমান

ভ্রমণ হবে সহজে

"পরবর্তীতে পড়ার জন্য শেয়ার করে রাখুন"